কবিতাসমূহ

বধ্যভূমি | প্রশান্ত মাতাল 

বহুকাল আগের পুরানো স্মৃতি
আজি আবার বারে বারে হানা দেয় হিংস্র হায়েনার মতো ।
বাড়ীর পেছনের শতবছরের কবরস্থান 
কি করে যেন মনের বধ্যভূমিতে রুপান্তর হলো মনে নেই ।
তবে ভুলি নাই নিস্ফলা কবরস্তানের মাটি গুলোতে ঝকঝকে সবুজ পাতার
বেহিসাবী বৃক্ষ গুলোকে ; যাদের কোনো কদর নেই মানবের সমাজে ।
ছোটবেলায় পড়ার টেবিলের চেয়ে প্রিয় ছিল টেলিভিশনের বদলে সাজানো বিছানা,
রাত ১০ টায় ও ঘুম কাটানোর নাম করে
করুন চোখে দেখতে হতো সাধের সাজানো বিছানা ।
সেই হতে শুরু ,
তারপর মায়ের কোল , গ্রামের খোলা প্রান্তরের ঘুড়ি ,
আবার কখন ও পাশের ক্লাসের সুন্দর দুচোখের মায়াবী ইশারা
আর ও কত কিছু যে পুঁতে দিয়েছিলাম এই বধ্যভুমিতে
তার হিসাব নাইবা করি আজ।
এইতো সেদিন কাছের বন্ধুটি বলল
" এত সহজে কবর দিয়ে দিলি তাজা পদ্মটিকে?"
কিন্তু সেতো জানে না
হৃদয়ের রক্তক্ষরণ বন্ধ হয়েছিল শুধুই শ্বেতকণিকার আপন শক্তিতে
তাই ব্যাথার জায়গাটা অবশ হয়ে গেছে বহুদিন আগে ।
রায়ের বাজারে আছে নানা বয়সী আর গোত্রের মানুষের হাড় ,
কিন্তু আমার বধ্যভুমিতে আছে
নানা রঙের নানান সময়ের ইচ্ছে আর আশার শ্বাস ।
নিজ হাতে পোতা হয়েছিল
কিছু কর্কশ রাগ , লালসা, বেদনা আর বঞ্ছনা সেই সাথে কিছু আশা ।
তাই সময়কে শুধু একটা বিমূর্ত আবাহন মনে হয়
যাতে চড়ে মাত্র পার হওয়া যায় গন্তব্য ছাড়া ঠিকানায় ।
তবে মনে হচ্ছে আবার বধ্যভুমি সবুজ হয়ে উঠবে ,
যেমন দেখেছিলাম কবরস্তানে বড় বড় গাছের মেলা ।
নতুন আশায় বুক বাঁধি মেঘনা তীরের মাঝির মতো
একদা মনের বধ্যভুমিতে কোনো মহীরুহের ঠিকানা হবে ।


ঘুণপোকা | প্রশান্ত মাতাল


বড়ই ক্ষমতা তোমার ঘুণপোকা
প্রথম তোমার কারুকাজ দেখে অবাক হয়েছিলাম
যেদিন আমার প্রিয় লৌহকাঠের টেবিল মিহি করে দিলে ।
ছাত্র - শিক্ষকের কদমবুসির বাঁধন একদা শুনতাম
আজ যখন দেখি জনৈক ছাত্র মহান শিক্ষকের হাত টান দিয়ে বলে
"চলেন দেরি না করে তাড়াতাড়ি মিছিলে"
বুঝি তোমার ক্ষমতার বহর বাড়িয়েছ বহুগুনে ।
হাজার বছরের গড়া সম্পর্কের বাঁধন
আর বৃদ্ধ দাদুর হাতের কর গুনে পরিবারের সদস্য হিসাব করার দিন শেষ,
এখন ঘরের চার বছরের বাবুটা এক মুহূর্তে বলে দেয়
আমরা মাত্র তিনজন ,
বুঝি তোমার বড়ই ক্ষমতা সত্যি ঘুনপোকা ।
গ্রামের সবচেয়ে ভালো ছেলেটা
মাথা নুইয়ে চলত সর্বদা ;
অথচ স্কুল বিতর্কের মঞ্চে উঁচু হাতের আঙ্গুলের ফাঁকে কলম দেখা যেত
কারনে অকারনে সে হত অনেক পরিবারের ছোটদের আদর্শ ,
শুনলাম একদিন জীবনের ডাকে গেল শিক্ষার বড় পরিসরে
এইতো সেইদিন দেখি তার মুখটা পত্রিকার পাতায়
আজো দেখি হাত উঁচু,
সেই হাতে কলমের বদলে পিস্তল আর মুখে ক্রুর হাসি ।
হুম স্বীকার করতেই হবে
তোমার ক্ষমতা অসীমে ঠেকেছে,
কারন বৃদ্ধ বাবা-মায়ের জন্য নাকি আজ বৃদ্ধাশ্রাম খোলা হচ্ছে অহরহ ।
তাই তোমায় সালাম করতেই হবে "ঘুনপোকা" ।


দ্বিধা | প্রশান্ত মাতাল


হয়তো তুমি
না না তা হয়না,
তাহলে “আমি “,
ঠিক, ... ঠিক তা ও না,
অতীত হলে কেমন হয়?
বিগত যে হারিয়ে গেছে বহু আগে ,
এবার নিশ্চয় অনাগত হবে ; কি বলো?
তুমি কি ভুলে গেছো ?
ইরোসের তীর সেই কবেই শেষ হয়ে গেছে ।
সামনের পুকুরটা অনেক সুন্দর লাগছে ,
“স্থিরতা” কেমন যেন মেঘলা দিনের মতো ।
তাহলে সমুদ্র ,
সুপ্ত ক্ষমতা আর ধ্বংস কেমন যেন একই সুতোয় গাঁথা ।
ঐ "নভেম্বর রেইন" মনে দাগ কাটে না ?
না , না , "কান্না"র সাথে যেন তার দোস্তি ।
ঝরনাকে ভালো লাগে ?
তুমি কি ঐ ইকোপার্কের ‘সুপ্ত প্রসবিণী’র কথা বলছো !
বাদ দাও , দেখো কি সুন্দর বাগান ,
এতো বড্ডো ছোট্ট !
চলো সুমদ্র পাড়ে যাই ,
ঐ 'কর্দমাক্ত জেলে পাড়া'র কথা বলছো ?
ঠিক আছে চলো বালি আর পাথরে বসি
সেথায় যে বড়ো বেশি 'রোদ্দুর' ।
তবে সব ভুলে কবিতা শুনি ,
ঐ কঠিন কঠিন পংত্তি-মালা শোনাতে চাও ?
তাহলে কবিদের নিয়ে কথা বলি?
ঐসব "সুতসরিত-হিপি"রা আমার দুচোখের বিষ , তা কি তুমি জানো না ?
হলিউডে কি আজো তৃপ্তি পাও ?
না, না ট্রয় – গ্ল্যাডিয়টরে হেলেন এর ছেয়ে বড়ো দৃপ্ত আরকিলিস-হেক্টর আর রক্ত।
সব ভুলে তবে কি আবার আমি ???
তা কি করে হয়?
তবে কি বিপ্লব তোমাকে টানে ?
না আজো আমি স্বপ্নে দেখি " নকশালী-বাকশালী"দের চিহ্ন-ভিন্ন দেহ ।
সমাজতন্ত্রে - গনতন্ত্রে তোমার ভক্তি নেই তবে -
প্রেতলিয়াতদের কষ্ট গুলো আর বুর্জোয়াদের দোর্দণ্ড প্রতাপ কি করে এক হয় ?
তবে কিসে তোমার ক্লান্তি ধরে ?
হয়তো কোনো বুনো ওলে,
না হয় কোনো মাকাল ফলে ,
অথবা কোনো নির্জন পাড়ে ,
হতে পারে কোনো অন্ধকার কোনে ।
সত্যি বড়ো অদ্ভুত তোমার দ্বিধা আর সবশেষে তোমারই পরাজয়ের মোড়কে অদ্ভুত জয় ।


বাঙ্গালীয় চেতনা | প্রশান্ত মাতাল

তোমার নেত্রযুগলে এতই প্রখরতা
যেন সূর্য হতে ধার করা সন্নিবেশিত রশ্মিমালা
যা কিনা এক পলকে ছারখার করে দিতে পারে
প্রিয়ামের একদা অপরাজেয় সুউচ্চ দেয়াল ।
তোমাকে বেঁধে রাখতে হয়
মায়াবী নিষেধের বেড়াজালে
না এক ঝলকে সপাং করে উঠে পড়বে
তাতে ধ্বসে যাবে হিটলারের গোপন কনসেনট্রেশন ক্যাম্প ।
তোমার গোপন অথচ তীব্র আবেগ অবদমিতই থাক ,
না হয় তুমি হয়ত হয়ে যাবে,
আরকিলিসের সেই অতৃপ্ত আত্মা
যা কিনা আধো স্বপনে ও হানা দিবে বারে বার ট্রয়ের ধ্বংসাবশেষে ।
তুমি তোমারই মতো থাক
চাই না আরেক ক্ষুদিরামের মতো
নতুন কোনো মর্মান্ত্রিক ফাঁসিকাষ্ঠের অবতারনা ,
দেখতে চাইনা চে'র মতো
নতুন কোনো বিপ্লবীর অসমাপ্ত অভিযান ।
যদি পারো একবার কাছে এসো
গ্লাডিয়েটরের মতো তীব্র আবেগ বুকে ধরে
শেষ বিন্দু শক্তি যুগিয়ে
জয় করো বহুদিনের সযতনে আঁকা সোনালী ছক ।
রাজদণ্ড নিজ হাতে নিয়ে
ফিদেল ক্যাস্ট্রোর মতো গড়ে তোল
আপন মহিমার ভালোবাসার ঘর ।। 


একটি ল্যাম্পপোষ্ট প্রশান্ত মাতাল


অনাবদ্ধ আখিঁযুগলে
নিষ্কম্প হাজার বছর ধরে
তাই মাঝে মাঝে ধান্দা লেগে যায় ।
সভ্যতার উত্থান হতে আলো দিয়ে যাচ্ছি অবিরত ,
আজো সমাজের গলিত লাশের পাহারা দিচ্ছি ,
তাই মাঝে মাঝে ধান্দা লেগে যায় ।
ইদানিং নিশিকারবারীদের জয়ধ্বনি বড়ো বেশী লক্ষ্য করি
আবার সাধুবাবার স্থিরতা ও দর্শনধারীতে আছে ।
নিশিকন্যাদের দুঃখ দেখতে দেয়নি তারা ,
আড়াল যাদের আজন্ম সাধ
রবিবাবু ও তাদের চেনে না
আমার নিষিদ্ধ কৌতূহল আজো জাগ্রত ।
সত্যি মাঝে মাঝে ধান্দা লেগে যায়,
কেউ এসে গলায় ফাঁস লাগায়
পৌরসভার লেবার চকচকে ও করে যায়
হাজার আফসোস বুকে পুষে রাখি নিজ স্বপ্নের সাথে ,
আলো বিলিয়ে যাওয়াই আমার
নির্ধারিত আজন্ম নিয়তি ।
তাই মাঝে মাঝে ধান্দা না লেগে পারে না ,
নিজের চারপাশ জ্বালিয়ের দিই
বহুদিনের সঞ্চিত প্রবল দুঃখ দিয়ে ।
মনে হয় ললাট লিখন ঈশ্বর প্রদত্ত
তাই আজো আবার রুটিন মেনে চলতে হয়
সমস্ত তিক্ততাকে আরো উজ্জ্বল করে উদ্গিরন করি ।
ইউরোপে আমার বড়ো কদর
প্রবল ঝড়-বৃষ্টির পর সামান্য সর্দিতে যদি নিঃশ্বাস বন্ধ করি ,
তারা সাথে সাথে ডাক্তার খবর দেয় ,
আফ্রিকায় আবার কেজি ধরে ও বিক্রি হই ,
কিন্তু বলতে পারি না তাদের
এশিয়ার নষ্ট সমাজের গল্প ,
কারন আমিতো আজন্ম বোবা এক ল্যম্পপোষ্ট ।



মৃত আত্মারা ।  প্রশান্ত মাতাল


গাড়ীর জঙ্গলে ভেঙ্গে চুরে দাঁড়িয়ে থাকে
শত শত খোয়াড়ের গাড়ি
যেন হাজার বছরের অত্যাচার রুখে টিকে থাকার
বাসনা নিয়ে তাদের জন্ম ।
নিরন্তর ছুটে চলার শপথ নিয়ে জন্ম যার
বুকে ধারন করে হাজার ঘোড়ার শক্তি
অথচ কি নির্মম তার পরিনতি
বুঝাই দায় আত্মারা তাদের অবাঞ্ছিত ঘোষনা করেছে ।
হাজার পরিকল্পনার সাথে হানা দেয় স্বপনরা
কল্প রাজপ্রাসাদ সাথে রাজকন্যারা
চিন্তাগুলি যখন প্রায় পরিশীলিত পাকা
জোর করে চোখের পাতা টেনে ধরে খুলে ফুটপাতের অন্ধ ভিক্ষুক কিন্তু করুনার ঝুলি যে বড়ই স্তিতিস্থাপক ।
এয়ার কন্ডিশন ঘর আর আধুনিক কল-কব্জা
চলে সীমানা নির্ধারণের নিরন্তর প্রচেষ্টা
প্রযুক্তির দেহ গলে দেখা দেয় " প্রায় মৃত রোগীর রক্ত দরকার "
শিরা - ধমনীর প্রবাহকে অস্বীকার করে মৃত মানবতার দলিল ।
অক্লান্ত শ্রম আর পরিকল্পনা খুলির কোটরে
হাজার খানেক উপদেশ বিলায় বিনা দামে এই চড়া বাজারে
সহোদরের আত্মার কষ্ট লাঘবের দায় কি
মমতার স্থান শুধুই জমা করায় খাতায়।
সুহৃদ মাঠে অপেক্ষায় তারপর প্রেয়সী চায়নিজে
বডি স্পে'র হালকা আবেশ দামী পরিচ্ছদে
রক্তের দেনা শোধ হয়তো হবে পরে
বছর খানেক হল মাত্র আধুনিক হয়েছি ।
স্যাটেলাইট চ্যানেল শোয়ার ঘরে ;হাতে হ্যলো যন্ত্র
চলার পথে বহু সাবলীল আকর্ষণীয় নয়ন
নিখাদ একজনে দিয়াছি মন দেখা যায় রঙ্গিন পর্দায়
আজ ভালোবাসাগুলি ও একরোখা উড়াউড়িতে মত্ত ।
শুনেছিলাম দুষ্ট আত্মারা থেকে যায় বাস্তবের কাছাকাছি
স্বাভাবিক শবদেহে ক্লান্তি ধরে যায়
যদি মানবিকতা, মায়া, ভালোবাসা আর করুনার স্বাভাবিক মরন না হয়
আর আত্মারা মৃত না হয় তবে জীবিতদের ডেরায় ও মৃত্যু হানা দেয় ।

কনে দেখা রোদ ।  প্রশান্ত মাতাল


ইদানিং বড়ো বেশি অবাক হই দৃষ্টি শক্তির গাঢ়তা লক্ষ্য করে ,
সেই দুষ্ট ছেলেটা ছিল পেতে রাখা মৎস্য শিকারির অবাধ্য বড়শির মতো
সামান্য আলোড়নে নত শির প্রবল তেজে ঋজু করে দাঁড়াতো ,
হয়তো তাতে সাঙ্গ হতো কোনো জীবন কিন্তু তার ভ্রুক্ষেপ করার সময় কই ।
প্যারাট্রুপারের দক্ষ হাতের প্যারাসুটের মতো ,
যার নিয়তির সাথে সর্বক্ষণ লড়াই বাধতো
অবাধ্য বাতাসের মতো সামান্য তোড়ে এক ঝটকায় সব পরিকল্পনা ভণ্ডুল করে দিতো ।
ইদানিং বড়ো বেশি অবাক হই দৃষ্টি শক্তির গাঢ়তা লক্ষ্য করে ,
কি করে যেন সব কিছু বদলে হয়ে গেল
নরসুন্দরের হাতের বাধ্য কাঁচির মতো ,
এক চুল এদিক ওদিক না করে মেনে লয় সমস্ত আদেশ ।
একদিন কামারের হাপরের মত অঙ্গার উসকে দেয়া ছিল যার কাজ ,
কামারের বুকের ঘর্মধারা তাকে না করত সামান্য বিচলিত ।
আজি সেই কিনা বড় বড় চোখে দেখে
ডাক্তার অপারেশান টেবিলে নিখুঁত হাতে তার হাতের অস্ত্র নাড়ছে কিনা ।
বাজ পাখির মত দৃষ্টি তীক্ষ্ণ করে রাখে
কারন সে নিশ্চিত করতে চায় ,
স্নাইপারের হাতের রাইফেল যেন শত মিটার দূরের
বুলহেডে লক্ষ্যভেদে বিফল না হয় ।
সত্যি ইদানিং বড়ো বেশি অবাক হই দৃষ্টি শক্তির গাঢ়তা লক্ষ্য করে ।
একদিন কামারের হাপরের মত অঙ্গার উসকে দেয়া ছিল যার কাজ ,
কামারের বুকের ঘর্মধারা তাকে না করত সামান্য বিচলিত ।
আজি সেই কিনা বড় বড় চোখে দেখে
ডাক্তার অপারেশান টেবিলে নিখুঁত হাতে তার হাতের অস্ত্র নাড়ছে কিনা ।







No comments :

Post a Comment

Thanx for commenting.